বিয়ে সবার জীবনে সবচাইতে আনন্দের বিষয়। এই আনন্দ আরো বেড়ে যায় যখন একে-অপরে সাথে দেখা সাক্ষাৎ পর্ব শুরু হয়। বিয়ের ক্ষেত্রে একে অপরকে ভালভাবে দেখা নেওয়া ইসলামের গুরুত্বপূর্ণ একটি নিয়ম।
বিয়ের জন্য পাত্র-পাত্রী দেখার নিয়ম সম্পর্কে ইসলামঃ
সাহাবা(রাঃ) এর বিয়ের ঘটনা অনেক রয়েছে। তারমধ্যে দুইটি হাদিস দিয়ে আমরা কিছু শিক্ষা গ্রহণ করতে পারি।
যেমন, মুগিরা বিন শোবা (রা.) বলেন, ‘আমি এক নারীকে বিয়ের প্রস্তাব দিলাম। এটা শুনে রাসুলুল্লাহ (সা.) আমাকে জিজ্ঞেস করলেন, ‘তুমি কি তাকে দেখেছ?’ আমি বললাম, ‘না, দেখিনি।’ তখন তিনি বললেন, ‘তাকে দেখে নাও।’ তোমার এই দর্শন তোমাদের দাম্পত্য জীবনে প্রণয়-ভালোবাসা গভীর হওয়ার ক্ষেত্রে সহায়ক হবে।’ (তিরমিজি: ১০৮৭)
আরেক হাদিসে এসেছে,
জাবির ইবনে আব্দুল্লাহ (রাঃ) সুত্রে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, তোমাদের কেউ যখন কোন নারীকে বিয়ের প্রস্তাব দিবে তখন সম্ভব হলে যেন তাঁর এমন কিছু দেখে নেয় যা তাকে বিয়ে করতে উৎসাহিত করে। এরপরে এই সাহাবী (রাঃ) বলেন, আমি একজন মেয়েকে বিয়ের প্রস্তাব দেওয়ার পরে তাকে দেখার আকাঙ্ক্ষা আমার অন্তরে গোপন ছিল। অতঃপর তাঁর মাঝে আমি এমন কিছু দেখি যা আমাকে তাকে বিয়ে করতে আগ্রহী করে তোলে। অতঃপর আমি তাকে বিয়ে করি। (সুনান আবু দাউদ ২০৮২)
অর্থাৎ আপনি যাকে বিয়ে করতে চান তাকে ভালভাবে দেখে নেওয়া ইসলামে বৈধ। আমাদের সমাজে পাত্র তাঁর পছন্দের পাত্রীকে দেখতে পারে-এটা খুব স্বাভাবিক।
কিন্তু পাত্রী কি পাত্রকে দেখতে পারবে?
বিয়ের ক্ষেত্রে যেমন পাত্র পাত্রীকে দেখতে পারবে ঠিক একইভাবে পাত্রীও পাত্রকে দেখে নিতে পারবে। কারণ এখানে উভয়ের মতামত এবং পছন্দের ব্যাপার রয়েছে। পাত্রীও নিজের পছন্দ অনুযায়ী পাত্রকে প্রস্তাব পাঠাতে পারবে, দেখতে পারবে।
অতএব বিয়ের ক্ষেত্রে পুরুষদের পাশাপাশি নারীদেরও বিয়ের জন্য পাত্র নির্বাচন করা, প্রস্তাব দেওয়া ইসলামে যায়েজ করা হয়েছে। আল-কুরআনুল কারীমে হজরত মুসা (আঃ) এর বিয়ের ঘটনা এসেছে।
সূরা কাসাস (২৫-২৭ নং আয়াত) হতে বর্ণিত,
শুয়াইব (আঃ) (মতান্তরে তিনি অন্য কেউ ছিলেন) এর দুই মেয়ে পশুকে পানি করানোর জন্য কূপের নিকট এসেছিল। যেখান থেকে পানি তুলবে সেই কূপের একটু দূরে তারা অপেক্ষা করছিল। কূপের ঢাকনা তুলে পানি তুলতে হত বালতি দিয়ে। ঢাকনা ছিল অনেক ওজনের এবং তারা পানি তোলার জন্য অপেক্ষা করছিল। দূরে থেকে মুসা (আঃ) দেখতে পেলেন এবং নিজে তাদেরকে পানি তুলে দিলেন।
বালিকা দুইজন বাড়িতে ফিরে তাদের পিতাকে এই উপকারের কথা জানালেন। পিতা সব শুনে তাদেরকে পাঠালেন মুসা (আঃ) কে বাড়িতে নিয়ে আসার জন্য।
অতপর দুই বালিকার একজন লজ্জজড়িত পদক্ষেপে তাঁর কাছে আগমন করলো। বললো, আমার পিতা আপনাকে ডেকেছেন, যাতে আপনি যে আমাদের পশুকে পানি পান করিয়েছেন তার বিনিময় পুরস্কার প্রদান করেন। অতপর মুসা যখন তাঁর কাছে গেলেন এবং সব বৃত্তান্ত বর্ণনা করলেন, তখন তিনি বললেন, ভয় করোনা। তুমি জালেম সম্প্রদায়ের কবল থেকে রক্ষা পেয়েছ। (সূরা কাসাস, আয়াত নং২৫)
এর পরে মুসা (আঃ) এর কিছু প্রশংসা গোপনে নিজের বাবার কাছে বর্ণনা করলেন ঐ দুই মেয়ে। যেমন,
قَالَتۡ اِحۡدٰىهُمَا یٰۤاَبَتِ اسۡتَاۡجِرۡهُ ۫ اِنَّ خَیۡرَ مَنِ اسۡتَاۡجَرۡتَ الۡقَوِیُّ الۡاَمِیۡنُ
“দুই বোনের একজন বললো, পিতা! তাকে চাকর নিযুক্ত করুন। কেননা, আপনার চাকর হিসাবে সে-ই-উত্তম হবে; যে শক্তিশালী ও বিশ্বস্ত। (সূরা কাসাস, আয়াত নং ২৬)
এখানে দুইটি গুণ মুসা (আঃ) এর যা একজন বোনের পছন্দ হয়েছিল। শক্তিশালী ও বিশ্বস্ততা। এখনও পাত্র নির্বাচনে এসব গুণাবলীকে গুরুত্ব দেওয়া উচিৎ। এরপরে শুরু হল বিয়ের প্রস্তাব বিনিময়।
আল-কুরআন অনুযায়ী,
قَالَ اِنِّیۡۤ اُرِیۡدُ اَنۡ اُنۡکِحَکَ اِحۡدَی ابۡنَتَیَّ ہٰتَیۡنِ عَلٰۤی اَنۡ تَاۡجُرَنِیۡ ثَمٰنِیَ حِجَجٍ ۚ فَاِنۡ اَتۡمَمۡتَ عَشۡرًا فَمِنۡ عِنۡدِکَ ۚ وَمَاۤ اُرِیۡدُ اَنۡ اَشُقَّ عَلَیۡکَ ؕ سَتَجِدُنِیۡۤ اِنۡ شَآءَ اللّٰہُ مِنَ الصّٰلِحِیۡنَ
“(বালিকার) পিতা মুসাকে বললেন, আমি আমার এই দুই কন্যার একজনকে তোমার সাথে বিয়ে দিতে চাই এই শর্তে যে, তুমি আট বছর আমার চাকরি করবে, যদি তুমি দশ বছর পূর্ণ কর, তা তোমার ইচ্ছা। আমি তোমাকে কস্ট দিতে চাইনা। আল্লাহর ইচ্ছার তুমি আমাকে সৎকর্মপরায়ণ পাবে।” (সূরা কাসাস, আয়াত নং ২৭)
এভাবে মুসা (আঃ) এর সাথে শুয়াইব (আঃ) এর কন্যার সাথে বিয়ে সম্পন্ন হয়।
এখানে পাত্রী নিজে পাত্র সম্পর্কে ভাল গুণ তাঁর বাবাকে জানিয়ে ছিলেন কিন্তু সিদ্ধান্ত নেননি। বাবা শুধু শুনেই বিয়ের আয়োজন করেননি; তাকে ডেকে এনে নিজে সরাসরি সব কথা শুনেছিলেন। তারপর নিজে আশ্বস্ত হয়ে কন্যার ইঙ্গিতকে বুঝতে পেরে বিয়ের প্রস্তাব প্রদান করেন। এখানে বাবা পাত্রকে বিয়ের প্রস্তাব দিয়েছিলেন এবং বিয়ের আয়োজন করেছিলেন। তাই পাত্রী তাঁর পছন্দ বা মতামত অভিভাবককে জানাতে পারবেন কিন্তু সিদ্ধান্ত দিতে পারবেননা। সিদ্ধান্ত অভিভাবক নিবেন।
ভাল পাত্রের দুই গুণাবলী, শক্তিশালী ও বিশ্বস্ততা:
কন্যা সরাসরি বিয়ের কথা বলেননি। বলেছিলেন বাবার সহযোগিতা হতে পারে কারণ সে শক্তিশালী এবং বিশ্বস্ত। কূয়া থেকে পানি তোলা এবং তাদের দিকে না তাকানোর মানসিকতা থেকে এই দুই বোনের মনে এই ভাল ধারণা সৃষ্টি হয়েছিল।
কন্যাদ্বয়ের কথা শুনে পিতা এরকম যুবক ছেলেকে নিজের বাড়িতে চাকর না বানিয়ে বরং জামাই করে রাখাকে বেশি সঠিক সিদ্ধান্ত হবে মনে করে বিয়ের প্রস্তাব দিলেন।
অতএব, রাসুলুল্লাহ (সাঃ) এর সাথে খাদিজা (রাঃ) এর বিয়ে যেমন পাত্রী এর অভিভাবকের পক্ষ থেকে প্রস্তাব এবং মুসা(আঃ) এর বিয়ের ক্ষেত্রেও একইভাবে পাত্রী এর অভিভাবকের পক্ষ থেকে প্রস্তাবে হয়েছিল। বিয়ের ক্ষেত্রে পাত্র যেমন পাত্রীকে প্রস্তাব দিতে পারবে একইভাবে পাত্রী পক্ষের অভিভাবক পাত্রকে প্রস্তাব দিতে পারবে।
পাত্র/ পাত্রীকে দেখার ব্যাপারে বিভিন্নভাবে দেখা যেতে পারে। যেমন, জাবির ইবনে আব্দুল্লাহ যখন জানতে পারলেন যে, যার সাথে বিয়ের কথাবার্তা চলছে তাকে সরাসরি দেখা যাবে তখন তিনি এমনভাবে দেখলেন যা তাঁর মধ্যে ঐ মেয়ের প্রতি আরো আগ্রহ বাড়িয়ে দিল।
তবে বর্তমানে যেভাবে দেখা হয় পারিবারিকভাবে সেটাও ঠিক আছে কিন্তু মাহরাম বা গায়রে মাহরাম মেনে দেখতে হবে।
পাত্রী দেখার শর্তগুলি হলঃ
এ সম্পর্কে হিদায়া ও আলমুগনী কিতাবে এসেছে, ইসলামের দৃষ্টিতে বিয়ের আগে গাইরে মাহরামদের মধ্যে শুধু পাত্রই পাত্রীকে শর্ত সাপেক্ষে দেখতে পারবে –
পাত্রী দেখার সময় পাত্র পক্ষের অন্য কোন পুরুষ যেমন, বাবা, ভাই, বন্ধুবান্ধব প্রমুখ কেউ পাত্রী দেখতে পারবে না। তাদের দেখা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ ও কবিরা গুনাহ। পাত্রীর সাথে পাত্র কথা বলতে পারবে তবে শরীরে স্পর্শ করতে পারবেনা।
খবরাখবর নেওয়ার পরে বিয়ে করতে মনস্থির করলে পাত্রীকে দেখে নেওয়া উত্তম। তবে এভাবে আনুষ্ঠানিকভাবে না দেখে অনানুষ্ঠানিকভাবে দেখে নেওয়াই উত্তম। দেখার সময় পাত্রী হাত ও মুখ দেখা যেতে পারে। কাপড়ের উপর দিয়ে যদি শরীরের সামগ্রিক অবয়ব দেখে নেওয়া যায় তাহলে কোন অসুবিধা নেই। আর হ্যাঁ শুধু বিয়ের করার উদ্দেশ্যেই পাত্রীকে দেখতে পারবে অন্য কোন উদ্দেশ্যে নয় (হিদায়াঃ ৪/৪৪৩ এবং আলমুগনিঃ ৭/৭৪)। পাত্রের পরিবারের নারীরা চাইলে পাত্রীকে দেখতে পারবে।
মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামিন আমাদেরকে বিয়ের ক্ষেত্রে সঠিকভাবে পাত্র/পাত্রী নির্ধারণের এবং দেখা সাক্ষাতের ফয়সালা করে দিন, সমাজে শান্তির ফয়সালা করে দিন। আমিন।